টাইম মেশিন-৩(শেষ পর্বের আগের পর্ব)

রকিবুল সাহেবের পরের অ্যাপয়েন্টমেন্টটা ছিল স্যার আইজ্যাক নিউটনের সঙ্গে। চাওয়া মাত্রই নিউটনকে আপেল তলাতে পাওয়া গেল। হাতে একটা বই নিয়ে চোখ বন্ধ অবস্থায় আইজ্যাক নিউটন আপেল তলায় বসে আছেন। টাইম মেশিনে সময়ের হিসেবে ভুল না হলে আর মাত্র ৫ মিনিট পরই সেই বিখ্যাত আপেলটি আকাশে না উড়ে মাটিতে পড়বে। আচ্ছা, এই ব্যাপারটা নিয়ে নিউটন সাহেবের সাথে কিঞ্চিৎ রসিকতা করলে কেমন হয়? কিঞ্চিৎ রসিকতা করার জন্যই হোক কিংবা বর্তমান সময়ের বিশাল কোন ক্ষতির জন্যই হোক রকিবুল সাহেব নিউটন সাহেবের পাশে গিয়ে বসলেন।
: স্যার ভাল আছেন?
: হ্যাঁ ভাল আছি। আপনাকে তো ঠিক চিনলাম না।
: স্যার আমাকে চিনবেন না তবে আমি আপনাকে চিনি।
: তাই?
: হ্যাঁ স্যার, আপনি আইজ্যাক নিউটন সাহেব। লোকমুখে শুনেছি আপনার নাকি অনেক বুদ্ধি, অনেক জ্ঞান।
নিউটন হাসতে হাসতে বললেন
: অবশ্যই ভুল শুনেছেন, জ্ঞান যদি পৃথিবী হয় তবে সত্যি বলতে কি আমি কেন আমরা সবাই মিলেও পৃথিবীতে পরে থাকা ছোট্ট একটা পাথর খণ্ডের সমান জ্ঞানও অর্জন করতে পারিনি।
নিউটনের ক্ষুদ্র জ্ঞান বিষয়ক কথাটা কেন জানি খুব পছন্দ হল রকিবুল সাহেবের। তিনিও নিউটন সাহেবের মতই হাসতে হাসতে বললেন
: তবে স্যার আমার ক্ষুদ্র জ্ঞান থেকে আমি একটা জিনিস বলতে পারি।
: কি?
: এখনই গাছ থেকে একটা আপেল পড়বে আপনার সামনে।
নিউটন কিছু বলতে চেয়েও বলার সুযোগ পেলেন না, বরং অবাক হলেন। কারণ সত্যি সত্যি একটা আপেল তার সামনে পড়ল।
: How is it possible?
: বললাম না স্যার আমি যা জানি আপনি তা জানেন না।
নিউটন কিছুক্ষণ চুপ থেকে বললেন
: কিন্তু আপনি যা ই বলেন, বললাম আর হয়ে গেল এমন নিতিতে আমি বিশ্বাসী নই, এর কোন বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা নিশ্চয় থাকবে, আমি আমার জীবনে বেশ কয়েকবার আপনার মত এমন মানুষ দেখেছি যারা অভিনব কিংবা অজানা উপায়ে ঘটনা ঘটার আগে অনেক কিছু বলে ফেলতে পারে।
: এটাকে কি বিজ্ঞান দারা ব্যাখ্যা করা সম্ভব হবে স্যার?
: অবশ্যই হবে, আমি বিশ্বাস করি যা গতকাল সম্ভব হল না তা আজ সম্ভব হবে, যা আজ সম্ভব হানা তা কাল হবে। আমি না পারলে আমার সন্তান এটা করে দেখাবে, সে না পারলে ভবিষ্যতে কেও না কেও অসম্ভবকে সম্ভব করবে, নিশ্চয় একটা দিন আসবে যখন অসম্ভব নামের শব্দটি ডিকশনারি ছাড়া আর কোথাও ব্যাবহার করা হবেনা।

নিউটন আপেল আকাশে না উড়ে মাটিতে পড়ার ব্যাখ্যা ফেলে কিভাবে কিছু মানুষ আগে থেকে ভবিষ্যত বলে দিতে পারে সেটা নিয়ে ভাবতে লাগলেন। নিউটনকে হঠাৎ অন্যমনস্ক দেখে রকিবুল সাহেব বললেন
: স্যার আপনি কি কিছু ভাবছেন?
: হ্যাঁ ভাবছি।
: আমি কি চলে যাব?
নিউটন কোনরকম ভদ্রতায় না গিয়ে বললেন
: হ্যাঁ
: স্যার আপনার সাথে যে আমার কিছু কথা ছিল?
: আপনি এক কাজ করুন কিছুদিন পরে আসুন, এই ধরুন এক সপ্তাহ, তখন না হয় আপনার সাথে কথা হবে।
: সময় আমার কাছে ব্যাপার না স্যার, আপনার কাজের সমস্যা হলে আমি না হয় আরও কিছুদিন পর আসব।
: তাহলে দু সপ্তাহ পর আসুন।
: ঠিক আছে স্যার আমি বরং তিন সপ্তাহ পর আসব ততদিনে আপনি ভাবুন।
নিউটন আর কিছু বললেন না, বই হাতে নিয়ে ভাবতে ভাবতে চলে গেলেন।

 

তিন সপ্তাহ পরে নিউটনকে আরশোলা আর পিপড়া হাতে তার বাড়ি থেকে অদূরের বাগানে পাওয়া গেল। টাইম মেশিনে এমন তিন সপ্তাহে স্বল্প ভ্রমণের পরে নতুন কি নিয়ে নিউটনকে চমকে দেওয়া যায় সেটা নিয়ে ভাবতে ভাবতে রকিবুল সাহেব নিউটনের দিকে এগিয়ে গেলেন।
: স্যার কেমন আছেন?
: হ্যাঁ ভাল আছি মি:—
খানিকক্ষণ অপেক্ষা করে নিউটন বললেন
: মি: রকিবুল সাহেব।
চমকে দেবার আশায় নিজে ই দারুণ চমকে গেলেন রকিবুল সাহেব, কেননা তিনি যখন আগেরবার নিউটনের সাথে দেখা করেন তিনি নিউটনকে তার নাম বলেন নি, তাহলে তিনি এসব জানলেন কি করে?
নিউটন কিঞ্চিৎ হাসতে হাসতে বললেন
: খুব অবাক হলেন তাইনা?
রকিবুল সাহেব তোতলাতে তোতলাতে বললেন
: হ্যাঁ মানে, অবশ্যেই।
: আমি মোটেও অবাক হচ্ছিনা, রকিবুল সাহেব মনে মনে আপনাকেই খুজছিলাম জানেন?
: কেন স্যার?
: আগে থেকে বলে ফেলার ক্ষমতার কারণ, বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা আমি দ্বার করিয়ে ফেলেছি, সেটা জানাবার জন্য।
: সত্যি?
: হ্যাঁ সত্যি, আগে থেকে কোন কিছু বলে ফেলার ক্ষমতা আসলে সব মানুষের টেলোড্রেনড্রাইনেই আগে থেকে তাকে, আপনি শুনলে অবাক হবেন আমরা যাদের নিম্নশ্রেণীর প্রাণী বলে অপবাদ দিচ্ছি তাদের আসলে এই ক্ষমতা প্রখর, এই ক্ষমতার একটা নাম আছে এক্সটা সেনসরি পারসেপশন, সংক্ষেপে ই.এস.পি যেটা হয়ত এতদিনে শুধু নিম্নশ্রেণীর প্রাণীর ই প্রবল ছিল।
: নিম্নশ্রেণীর প্রাণীর প্রবল তা বুঝলেন কি করে?
: বই পড়ে জেনেছি, অভিজ্ঞতা দিয়েও বুঝেছি, এক্সপেরিমেন্ট ও করেছি, করছি। আপনি শুনলে অবাক হবেন কোন এলাকায় ভূমিকম্প, বৃষ্টি শুরু হবার আগে আপনি কখনও ঝি ঝি পোকার ডাক শুনতে পাবেন না।
নিউটন বলে চললেন
: অবাক হচ্ছেন তাই না? কিন্তু কথা সত্য, পিপড়াকে কখনও দেখেছেন বৃষ্টিতে ভিজতে কিংবা ভেষে জেতে, কিংবা কখনও শুনেছেন ভূমিকম্পে হাতি মারা গেছে?
: না!
: এরা আসলে প্রচণ্ড ইএসপি ক্ষমতাধর। যেই ক্ষমতা এতদিন ওদের অর্থাৎ নিম্নশ্রেণীর একারই ছিল কিন্তু—-
: কিন্তু কি?
: এখন মানুষ ও হবে প্রচণ্ড ইএসপি ক্ষমতাধর।
: কিভাবে?
: এটা দিয়ে।
নিউটন তার কাঁধের ব্যাগ থেকে ত্রিকোণাকার একটা বস্তু বের করলেন। অদ্ভুত ধরনের বস্তুটার দিকে একভাবে তাকিয়ে থাকলে কেমন ধাঁধা লেগে যায়। রকিবুল সাহেব মুখে যতটা সম্ভব বিস্ময় প্রকাশ করে বললেন
: এটা কি?
: এটা আসলে কিছুই না আবার অনেক কিছু।
: মানে?
নিউটন হাসতে হাসতে বললেন
: বুঝতে পারলেন না তাই তো?
: ঠিক তাই।
: আমি আপনাকে বুঝিয়ে দিচ্ছি, এই যন্ত্রটির প্রথমত চোখে অপটিকাল ইলুশন তৈরী করে, একভাবে এর দিকে তাকিয়ে থাকলে এটি সরাসরি নিউরনের টেলোড্রেনড্রাইন নামক যায়গাটায় সূক্ষ্ম একটা কম্পনের সৃষ্টি করে, আপনি শুনলে অবাক হবেন নিউরনের ট্রেলোড্রেনড্রাইন এমন একটি যায়গা যেটা মানুষের কোন স্মৃতিই ঠিক নষ্ট হতে দেয়না।
: কিন্তু এই যন্ত্রটা কি করছে?
: রকিবুল সাহেব?
: জি, বলুন।
: আপনার পা এখন কি কাজ করছে?
:দাড়িয়ে আছে।
: আমার এই যন্ত্রটি থেকে যে ইলুশন তৈরি হচ্ছে তা চোখের রেটিনা গ্রহণ করার পর মস্তিষ্কে নিউরনে পাঠাচ্ছে। এই অজানা রশ্মি নিউরনের চারপাশে ছড়িয়ে যাবার বদলে টেলোড্রেনড্রাইনে প্রবেশ করছে এবং নতুন উদ্দীপনা তৈরি করছে, এবং যে অংশটার জন্য এক্সটা সেনসরি পাওয়ার দিয়ে মানুষ আগে ভাগে সব বলে দিতে পারে সে অংশটায় আলোড়ন সৃষ্টি করছে এই বস্তুটা। ফলে নিউরনের ইএসপি পাওয়ার যাচ্ছে বেরে, বুঝেছেন?
: জি বুঝেছি।
: কিন্তু এই যন্ত্রটায় একটা সমস্যা রয়ে গেছে।
: কি সমস্যা?
: মাঝে মাঝে এটা ইএসপি পাওয়ারকে বাড়াবার বদলে তীব্র হেলুসিনেশন তৈরি করছে।
: তাই, তখনকার অনুভূতি কেমন?
: আমার ক্ষেত্রে খুবই ভয়াবহ।
নিউটন খানিকক্ষণ চুপ থেকে বললেন
: গতকাল রাত্রের ঘটনা, যন্ত্রটার দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকতেই কেমন বমির মত পেল, তারপর হঠাত অবাক হয়ে দেখলাম আমার হাতটা ক্রমশ লম্বা হয়ে যাচ্ছে, আমি বুঝতে পারলাম মস্তিষ্ক ভুল সিদ্ধান্ত পাঠাচ্ছে, নিশ্চয় এটা মস্তিষ্কের অক্সিজেনকে আয়নিত করে অক্সিজেন নষ্ট করে দিচ্ছে। আমি তখনই চোখ বন্ধ করে শুয়ে পড়লাম।
: বেশ ভয়াবহ অবস্থা তাহলে।
: হু, সেটা নিয়ে ই পরীক্ষা করছি।
নিউটন অজানা গাছের একটা ডাল ভাঙতে ভাঙতে বললেন
: আমার কি মনে হয় জানেন?
: কি স্যার?
: গাছেরও বোধ করি প্রাণ আছে।
: আছে ই তো, কেন স্যার আপনি জানেন না?
একথা বলার পরেই রকিবুল সাহেবের মনে পড়ে গেল তিনি প্রায় ৩৫০ বছর অতিতে আছেন, উদ্ভিদের প্রাণ আছে সেটা পাকাপাকি ভাবে এখনকার মানুষের জানবার কথা নয়। নিউটন অবাক হয়ে বললেন
: গাছের প্রাণ আছে? আপনি জানলেন কিভাবে?
: না স্যার আমার এমনি মনে হল, গাছের প্রাণ না থাকলে সেটা বড় হয় কি করে?
: যুক্তিটা ঠিক, কিন্তু আমার মস্তিষ্ক যদি আমার সাথে বিশ্বাস ঘাতকতা না করে এবং আপনার যদি বলতে সমস্যা না হয় তবে রকিবুল সাহেব বলবেন কি জগদীশ চন্দ্র বসু টা কে?
রকিবুল সাহেব আরও একবার অবাক হলেন, কারণ তিনি এই মুহূর্তে জগদীশ চন্দ্র বসুর কথায় ভাবছিলেন, যেই মহান বিজ্ঞানি আবিষ্কার করেছিলেন(নাকি করবেন?) “উদ্ভিদেরও প্রাণ আছে।” রকিবুল সাহেব সত্য গোপন করে বললেন
: স্যার জগদীশ? ও স্যার আমার বন্ধু, ওরে ও আমার মতই ধারণা উদ্ভিদেরও প্রাণ আছে হয়ত।
: হু, বড়ই ভাবনার বিষয়, গাছের প্রাণ? ব্যাপারটা সহজ মনে হলেও প্রমাণ করা কি জটিল হবে?
রকিবুল সাহেব বুঝতে পারলেন নিউটন কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই আগের বারের মতিই চিন্তায় মগ্ন হয়ে গিয়েছেন। নিউটন রকিবুল সাহেবকে বললেন
: রকিবুল, তুমি থাক আমি চললাম।
: স্যার, আবার কবে আসব বললেন না তো?
নিউটন রকিবুল সাহেবের কথার কোন উত্তর না দিয়ে মনে মনে শুধু কয়েকবার বললেন “গাছের জীবন?”

রকিবুল সাহেব নিউটনের চলে যাবার পথপানে চেয়ে চেয়ে একবার শুধু মাথা নেড়ে মৃদু হেসে বললেন
: অদ্ভুত মানুষ!

পছন্দের পোষ্টে যোগ করুন
ব্লগার ABsiddik লিখেছেন সবার ব্লগের জন্য এই লেখাটি , ব্লগার ABsiddik সবার ব্লগের জন্য মোট ব্লগ লিখেছেন ১৫ টি এবং মন্তব্য করেছেন 33 টি , তার বিষয়ে জানতে এবং অন্যান ব্লগ গুলো দেখতে ব্লগার ABsiddik এর প্রোফাইল দেখুন ।

এই ব্লগ পোষ্ট টির সকল বিষয়বস্তু ও বক্তব্য একান্তই ব্লগার ABsiddik এর, এবং লেখাটির নৈতিক ও আইনগত দায়দায়িত্ব তাহার, এবং সকল মন্তব্যের দায়দায়িত্ব উক্ত মন্তব্যকারীর , সবার ব্লগ কর্তপক্ষ কোনোভাবেই দায়ী থাকবে না।

লেখাটি গল্প বিভাগে প্রকাশিত হয়েছে.

৭ মন্তব্য রয়েছে “টাইম মেশিন-৩(শেষ পর্বের আগের পর্ব) ব্লগ টি তে

  1. অবিবেচক দেবনাথ বলেছেন : ডিসেম্বর ৮, ২০১১ at ১১:৪৮ পুর্বাহ্ন

    দুর্দান্ত লেখা, শেষ পর্বের অপেক্ষায় রইলাম সিদ্দিক ভাইয়া।

    • ABsiddik বলেছেন : ডিসেম্বর ৮, ২০১১ at ১২:১১ অপরাহ্ন

      ধন্যবাদ, পরের লেখাটা কবে চান বলুন? সেদিনই দিব।
      অ:ট: আমার বয়স ২১, আপনি আমায় নাম ধরে ডাকতে পারেন।

  2. গোধুলীর সূর্য বলেছেন : ডিসেম্বর ৮, ২০১১ at ১১:৫৯ পুর্বাহ্ন

    আমি যদি এইরকম একটা টাইমমেশিন পাইতাম তাহলে সবার মাথা নষ্ট করে দিয়ে আসতাম

  3. ABsiddik বলেছেন : ডিসেম্বর ৮, ২০১১ at ১২:১৫ অপরাহ্ন

    শেষ পর্ব পরার পর আপনি এ কথা বলার সাহস পাবেন না বলে আমার ধারনা।
    চক্র ভাঙা যে খুব কষ্ট।

  4. ইচঁড়ে পাঁকা বলেছেন : ডিসেম্বর ৮, ২০১১ at ১:২৩ অপরাহ্ন

    পরের পর্বের জন্য অধির আগ্রহে বসে রইলাম।

  5. দিশার সাহেব বলেছেন : ডিসেম্বর ৮, ২০১১ at ৪:১৬ অপরাহ্ন

    ভাই আগের পর্ব গুলার লিন্ক দেন।

ব্লগটির বিষয়ে মন্তব্য লিখুন